
বরিশালে সুসংগঠিত ‘হানিট্র্যাপ’ চক্রের থাবা:
মূলহোতা ঝাড়ুদার শাহিন, অটো ফারুক ও জয়সহ ভূয়া সাংবাদিকের ১০টি গ্রুপে সক্রিয় অন্তত ৬৫ জন সদস্য:
আল আমিন গাজী ঃ
বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকায় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ‘হানিট্যাপ’ বা প্রেমের ফাঁদে ফেলে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে পুরুষ নির্যাতন ও অর্থ আদায়ের অপরাধ। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এর আগেও এমন বহু লোমহর্ষক ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে কোতোয়ালি ও কাউনিয়া থানা এলাকার অলিগলিতে। এসব চক্রের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন সমাজের বিত্তশালী ও সাধারণ মানুষ। তবে মানসম্মান ও সামাজিক মর্যাদার ভয়ে বেশিরভাগ ভুক্তভোগী মুখ খুলতে সাহস পান না। ইতোমধ্যে কোতোয়ালি থানা পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে একাধিক চক্রের সদস্য আটক হলেও আতঙ্ক কাটছে না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশালে অন্তত ১০টি সক্রিয় গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রায় ৬৫ জন সদস্য নিয়মিত এই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। চক্রগুলোর সাথে নামসর্বস্ব কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টালের কথিত সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের পদধারী কিছু অসাধু নেতাকর্মী এবং প্রশাসনের কতিপয় অসাধু সদস্যের যোগসাজশ রয়েছে। তাদের মূল টার্গেট সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও বিত্তশালী ব্যক্তিরা।
চক্রের নারী সদস্যরা প্রথমে সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের টার্গেট করে ‘রং নম্বর’ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগের সূচনা করে। সুমিষ্ট কথায় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলার পর ওই ব্যক্তিদের শারীরিক সম্পর্কের লোভ দেখিয়ে পূর্বনির্ধারিত কোনো গোপন আস্তানায় বা বাসা-বাড়িতে ডেকে আনা হয়। ভুক্তভোগী ঘরে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরেই নারীরা সংকেত দিয়ে বাইরে ওত পেতে থাকা সহযোগীদের ডেকে আনে। মুহূর্তে ঘরে প্রবেশ করে ভুয়া সাংবাদিক ও অসাধু চক্রের সদস্যরা। এরপর ভুক্তভোগীকে মারধর ও মানসিক নির্যাতন চালিয়ে জোরপূর্বক ওই নারীর সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে এসব ছবি বা ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা পরিবারকে দেখানোর ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করা হয়।
বরিশাল নগরীর বিভিন্ন স্থানে অতীতে বিক্ষিপ্তভাবে এমন ঘটনা ঘটলেও বর্তমানে কোতোয়ালি ও কাউনিয়া থানাধীন আবাসিক এলাকাগুলোতে এই অপরাধের প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। নিরিবিলি বাসা ভাড়া নিয়ে এই চক্রগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা সমাজের ভয়ে থানায় অভিযোগ করতে আসেন না, যার সুযোগ নেয় অপরাধীরা। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সম্প্রতি কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কোতোয়ালি থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে ইতোমধ্যে একাধিক হানিট্র্যাপ চক্রের সদস্যকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব হানিট্র্যাপ গ্রুপের পেছনে সরাসরি কাজ করছে নামমাত্র কিছু অনলাইন নিউজ পোর্টালের কথিত সাংবাদিক ও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু সদস্য। পরিচয় গোপন রেখে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে তারা ভুক্তভোগীদের ব্ল্যাকমেইল করতে বাধ্য করে।
হানিট্যাপ চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়া এক ভুক্তভোগী তাঁর বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “প্রথমে একটি অজানা নম্বর থেকে ফোন আসে। কিছুদিন মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে একটি বাসায় ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। ঘরে ঢোকার পরপরই মেয়েটি ফোনে কাউকে ইশারা করে। মুহূর্তের মধ্যে সাংবাদিক ও প্রশাসন পরিচয় দেওয়া একদল লোক ঘরে ঢুকে আমাকে বেধড়ক মারধর করে এবং বিবস্ত্র করে ভিডিও ধারণ করে।” তিনি আরও জানান, চক্রটি তাঁর মোবাইল ফোন, হাতের আংটি ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ভিডিও ভাইরাল করার হুমকি দিয়ে আরও ১ লাখ টাকা দাবি করে। সম্মানের কথা চিন্তা করে তিনি বিকাশের মাধ্যমে আরও ৬০ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হন। সমাজ ও পরিবারের ভয়ে এ ধরনের শত শত ভুক্তভোগী নীরবে নির্যাতন সহ্য করে যাচ্ছেন, যা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ- পুলিশ কমিশনার বেলাল হোসাইন ( পিপিএম) সময়ের বার্তাকে বলেন, হানিট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইলিং চক্রের সাথে জড়িতদের তালিকা তৈরি করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কাউনিয়া ও কোতোয়ালি থানাসহ পুরো মেট্রোপলিটন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোনো ভুয়া সাংবাদিক বা অপরাধী চক্রকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। সাধারণ মানুষকে যেকোনো সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এছাড়াও তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন সময় এসব চক্রের একাধিক অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদি কোন ভূক্তভোগী অভিযোগ দেয় তাহলে সাথে সাথে আইন-কানুন ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।
প্রতিবেদকের নাম 











