
আদালতের নির্দেশের পরও অধরা রুবেল-রফিক চক্র; এসআই সনেটের মিথ্যার আশ্রয়ে আসামি বাদ দেওয়ার অকাট্য প্রমাণ নিয়ে বিএমপি কমিশনারের কার্যালয়ে তালাশ বিডির ঢাকা টিম
স্টাফ রিপোর্টার বরিশাল।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের চরম গাফিলতি, মিথ্যার আশ্রয় ও অনৈতিক লেনদেনের কারণে বর্তমানে নিজের ও পুরো পরিবারের জীবন নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ‘তালাশ বিডি’র অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিক মাছুদুর রহমান আসলাম। শীর্ষ সন্ত্রাসী, চিহ্নিত মাদক কারবারি ও স্থানীয় প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের একের পর এক চাঞ্চল্যকর অপকর্ম সাহসিকতার সঙ্গে উন্মোচন করায় তার ওপর নেমে এসেছে এই ভয়াবহ প্রাণনাশের হুমকি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৭ই ডিসেম্বর রাত আনুমানিক ১০:৩০ মিনিটে বরিশাল নগরীর ১৪ নং ওয়ার্ডের রিফিউজি কলোনি এলাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ‘নাক কাটা’ রুবেল ও ‘গাঁজা’ রফিক বাহিনী প্রকাশ্যে এলাপাতাড়ি গুলি বর্ষণ করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। এই সন্ত্রাসী তাণ্ডবের বিরুদ্ধে সাংবাদিক আসলাম তালাশ বিডিতে ধারাবাহিক একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
সংবাদ প্রকাশের পর সন্ত্রাসী চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এরই জেরে গত ২১শে জানুয়ারি সন্ধ্যায় বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাঠসংলগ্ন রাস্তায় আসামি ‘নাক কাটা’ রুবেল, ‘গাঁজা’ রফিক, মাইনুল ও তাপসের উপস্থিতিতে তাদের ক্যাডার বাহিনীর সদস্যরা সরাসরি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন করে সাংবাদিক আসলামকে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেয়।
পরবর্তীতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে বরিশাল ৩য় যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলার আর্জি পেশ করা হয়। বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট সার্বিক ঘটনা ও তথ্যপ্রমাণ নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পান এবং কোতোয়ালি মডেল থানাকে ঘটনাটি সরাসরি এজাহার বা এফআইআর (FIR) হিসেবে গণ্য করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, বিজ্ঞ আদালতের স্পষ্ট নির্দেশনা ও থানায় মামলা রজু হওয়ার পরও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে দৃশ্যমান বা কার্যকর কোনো অভিযান পরিচালনা করেনি কোতোয়ালি মডেল থানা পুলিশ। বিশেষ করে বর্তমান মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কোতোয়ালি মডেল থানার এসআই রাজিব দাস সনেটের ভূমিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম প্রশ্ন ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলার তদন্ত চলাকালে এক আসামিকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছিলেন এসআই রাজিব দাস সনেট। কিন্তু পরবর্তীতে সেই আসামির পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অনৈতিক অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে এবং তথ্য গোপন করে তাকে মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) থেকে রহস্যজনকভাবে নাম বাদ দেন এই কর্মকর্তা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের এমন অনৈতিক অপকর্ম ও মিথ্যাচারের অকাট্য দালিলিক প্রমাণ ইতোমধ্যে ‘তালাশ বিডি’র অনুসন্ধানী টিমের হাতে এসেছে। এ বিষয়ে সরাসরি বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) পুলিশ কমিশনারের কাছে আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ ও প্রামাণ্য নথিপত্র হস্তান্তরের জন্য ইতোমধ্যে ‘তালাশ বিডি’র ঢাকা হেড অফিস থেকে একটি বিশেষ প্রতিনিধি দল ও অনুসন্ধানী টিম বরিশালের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।
অন্যদিকে, অতীতে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশের জেরে মাছুদুর রহমান আসলাম কুপিয়ে রক্তাক্ত করেন, সেই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এসআই সামিরুন মন্ডল। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি বর্তমানে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের (বিএমপি) আওতাধীন কোনো থানাতেই আর দায়িত্বপ্রাপ্ত বা কর্মরত নেই। অভিযোগ রয়েছে, পূর্বে তার দায়িত্বে থাকাকালীনও অনৈতিক প্রক্রিয়ায় আসামি বাদ দেওয়ার নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছিল।
বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রাজিব দাস সনেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চরম দায়িত্বহীনতা লক্ষ্য করা গেছে। আসলামের অবোধ ছোট ছেলেকে স্কুলে যাওয়ার পথে বড় ধরনের ক্ষতি করা ও অপহরণের হুমকি দেওয়া সত্ত্বেও বারবার অবহিত করা হলেও এসআই সনেট কোনো সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নেননি এবং আসামিদের আটক করতে কোনো রেইড বা অভিযান চালাননি।
অপরদিকে, ‘গাঁজা’ রফিকের অপকর্ম নিয়ে রিপোর্ট করায় আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে রফিকের স্ত্রী, বরিশাল নগরীর চিহ্নিত মাদক সম্রাজ্ঞী তনু বেগম সরাসরি ফোন করে সাংবাদিক আসলামকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং তাকে বেআইনি অস্ত্র ও মাদক দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়াসহ সপরিবারে হত্যার হুমকি দেয়। এই কল রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুরো বরিশালজুড়ে তোলপাড় ও সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
উল্লেখ্য, সাংবাদিক মাছুদুর রহমান আসলাম পেশাগত জীবনে একাধিক রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশ করেছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে ইরান-আমেরিকার যুদ্ধের সুযোগে বরিশাল নগরে অকটেন ও পেট্রোলের অবৈধ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে তথ্যবহুল প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চরকাউয়া কর্নকাঠি এলাকার সাবেক প্রভাবশালী কালাম মেম্বার ও তার ভাতিজা ছাত্রলীগ নেতা শাওনের অপকর্ম নিয়ে টানা দুই পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশসহ বহু ঝুঁকিপূর্ণ সাংবাদিকতা করেছেন তিনি।
বিশেষ করে বিগত সরকার আমলে এক প্রভাবশালী শ্রমিক লীগ নেতার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিলাসবহুল ‘স্বর্ণ কমল’ প্রাসাদ নির্মাণের ওপর ধারাবাহিক একাধিক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেন তিনি। সেই সংবাদের জেরে ওই শ্রমিক লীগ নেতা সাংবাদিক আসলামকে নানাভাবে হয়রানি করতে আদালতে একাধিক মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। তবে আদালতে আসলামের প্রকাশিত নিউজের সপক্ষে উপস্থাপিত তথ্যপ্রমাণ শতভাগ সত্য প্রমাণিত হওয়ায় কোনো মামলাতেই তার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়নি এবং তিনি সম্মানজনকভাবে খালাস পান।
এছাড়াও বরিশাল নগরীর পরেশ সাগর স্কুল মাঠে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ অমান্য করে অবৈধ মেলা আয়োজনের বিরুদ্ধে তালাশ বিডি-তে একের পর এক তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশ করেন আসলাম। শুধু সংবাদ প্রকাশ করেই ক্ষান্ত হননি, জনস্বার্থে সাহসিকতার সঙ্গে জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে মহামান্য হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করেন তিনি। সত্য প্রকাশের এই সাহসী ও আপসহীন ভূমিকার কারণেই বারবার প্রভাবশালী ও অপরাধী সিন্ডিকেটের চরম আক্রোশের শিকার হচ্ছেন তিনি।
তালাশ বিডির সম্পাদক রেদোয়ান রনি তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
”আসলাম দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সততার সঙ্গে সাংবাদিকতা করছে। পূর্বেও মাদকের বিরুদ্ধে লেখায় তাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছিল। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে মামলা হওয়ার পরও তদন্ত কর্মকর্তা সমিরুন মন্ডল কোনো আসামিকে গ্রেফতারে অভিযান চালাননি। উল্টো অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে চার্জশিট থেকে আসামির নাম বাদ দেওয়া এবং নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করা চরম অনীতি।তালাশ বিডির সম্পাদক জানান আমাদের ঢাকা হেড অফিসের স্পেশাল টিম বিএমপি পুলিশ কমিশনার স্যারের সাথে দেখা করে এসআই সনেটের অপকর্মের যাবতীয় প্রমাণ হস্তান্তর করবে এবং বিভাগীয় শাস্তির জোর দাবি জানাবে।”
পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক ও জীবন বিপন্ন হওয়ায় সম্পাদক আপাতত আসলামকে বরিশালের মাঠপর্যায়ের কাজ বন্ধ রেখে ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে চলে আসার নির্দেশ দিয়েছেন।
পুরো ঘটনায় বরিশাল নগরজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হলে বিএমপির ভারপ্রাপ্ত পুলিশ কমিশনার জানান, বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) আদেশ দিয়েছেন যাতে জরুরি ভিত্তিতে ১৭ই ডিসেম্বরের হামলা ও ২১শে জানুয়ারি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনসহ সাংবাদিক পরিবারকে হুমকির সাথে জড়িত সন্ত্রাসী ‘নাক কাটা’ রুবেল, ‘গাঁজা’ রফিক, তনু বেগমসহ পুরো চক্রকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়।
এখন সচেতন মহলের প্রশ্ন—ঢাকা থেকে আগত স্পেশাল টিমের মাধ্যমে তথ্যপ্রমাণ হাতে পাওয়ার পর পুলিশ প্রশাসন কি অসাধু তদন্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে এবং সাংবাদিক আসলাম ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, নাকি অসাধু কর্মকর্তা ও সন্ত্রাসী সিন্ডিকেটের কাছে আইন অধরাই থেকে যাবে?
প্রতিবেদকের নাম 













