শেবাচিমে দেলোয়ারের দৌরাত্ম্য: রোগী ভাগানো থেকে চাঁদাবাজি, অভিযোগের অন্ত নেই

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে সক্রিয় এক প্রভাবশালী দালালচক্রের প্রধান এবং একাধিক অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেনের কর্মকাণ্ডে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালকে কেন্দ্র করে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অভিযোগের মাধ্যমে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শেবাচিম হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গ্রামের সহজ-সরল রোগীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ রয়েছে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে। চিকিৎসকরা কোনো পরীক্ষার (টেস্ট) পরামর্শ দিলে, দেলোয়ারের অধীনে থাকা প্রায় ৫০ সদস্যের একটি বাহিনী রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। সেখান থেকে দেলোয়ার ও তার সহযোগীরা বড় অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

### রাজনৈতিক রূপবদল ও ‘স্বঘোষিত’ পদবি

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের অবস্থান ধরে রাখতে দেলোয়ার কৌশলে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত তাজুলের নির্দেশে শেবাচিম হাসপাতালকে দালালচক্রের হাতে জিম্মি করে রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তাজুল আড়ালে থেকে দেলোয়ারকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতেন।

বর্তমানে দেলোয়ার নিজেকে ‘বিএনপি নেতা’ হিসেবে দাবি করছেন এবং স্বঘোষিত ‘আউটসোর্সিং কর্মচারী নেতা’ পরিচয়ে হাসপাতালে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও দালালির অভিযোগে র‍্যাবের হাতে আটক হওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।

দেলোয়ারের বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের আটকে থাকা বেতন আদায় এবং প্রশাসনিক কাজে ঢাকা যাতায়াতের খরচের কথা বলে বড় অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে। একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শেবাচিম হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দেলোয়ার বাহিনীর বিভিন্ন শাখা সুসংগঠিতভাবে কাজ করে বলে অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—

প্রথম গ্রুপ রোগী ও তাদের স্বজনদের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দ্বিতীয় গ্রুপ:বহির্বিভাগে (আউটডোর) চিকিৎসাসেবার টিকিট কাটতে আসা নিরীহ রোগীদের ব্যাগ থেকে সুযোগ বুঝে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা চুরির অভিযোগ রয়েছে।

তৃতীয় গ্রুপ: হাসপাতালে রোগীদের দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে সুযোগ বুঝে তা চুরি করে দূরবর্তী এলাকায় পাচার করার অভিযোগ রয়েছে।

শেবাচিম কম্পাউন্ডে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রেখে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট চালককে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া, হাসপাতালের পঞ্চম তলায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত ‘ডক্টরস ক্যান্টিন’-এর পরিচালক মজেদ ও তার ছেলে আরিফুর রহমানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়ে ক্যান্টিনটি দখলের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ রয়েছে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে। দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

হাসপাতালের সামনের এক চা-দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বরিশাল মেডিকেল রোড এলাকার বিতর্কিত ‘বিসমিল্লাহ আবাসিক হোটেল’-এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক বিক্রির সঙ্গেও দেলোয়ার বাহিনীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এবং সংবাদের তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ এবং ভিত্তিহীন প্রতিবাদ জানানোর জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার, পিপিএম-এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে পরবর্তী প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।

Tag :
About Author Information

Barta Times bd

শেবাচিমে দেলোয়ারের দৌরাত্ম্য: রোগী ভাগানো থেকে চাঁদাবাজি, অভিযোগের অন্ত নেই

শেবাচিমে দেলোয়ারের দৌরাত্ম্য: রোগী ভাগানো থেকে চাঁদাবাজি, অভিযোগের অন্ত নেই

আপডেট সময় : ০৪:২৮:৪৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল। বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে সক্রিয় এক প্রভাবশালী দালালচক্রের প্রধান এবং একাধিক অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত দেলোয়ার হোসেনের কর্মকাণ্ডে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দূর-দূরান্ত থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালকে কেন্দ্র করে রোগী ভাগিয়ে নেওয়া, বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অভিযোগের মাধ্যমে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শেবাচিম হাসপাতালকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গ্রামের সহজ-সরল রোগীদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ রয়েছে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে। চিকিৎসকরা কোনো পরীক্ষার (টেস্ট) পরামর্শ দিলে, দেলোয়ারের অধীনে থাকা প্রায় ৫০ সদস্যের একটি বাহিনী রোগীদের ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ। সেখান থেকে দেলোয়ার ও তার সহযোগীরা বড় অঙ্কের কমিশন হাতিয়ে নেন বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

### রাজনৈতিক রূপবদল ও ‘স্বঘোষিত’ পদবি

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজের অবস্থান ধরে রাখতে দেলোয়ার কৌশলে রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করতে শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাদিক আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত তাজুলের নির্দেশে শেবাচিম হাসপাতালকে দালালচক্রের হাতে জিম্মি করে রাখার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তাজুল আড়ালে থেকে দেলোয়ারকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতেন।

বর্তমানে দেলোয়ার নিজেকে ‘বিএনপি নেতা’ হিসেবে দাবি করছেন এবং স্বঘোষিত ‘আউটসোর্সিং কর্মচারী নেতা’ পরিচয়ে হাসপাতালে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগেও দালালির অভিযোগে র‍্যাবের হাতে আটক হওয়ার ঘটনাও রয়েছে বলে জানা গেছে।

দেলোয়ারের বিরুদ্ধে আউটসোর্সিং কর্মচারীদের আটকে থাকা বেতন আদায় এবং প্রশাসনিক কাজে ঢাকা যাতায়াতের খরচের কথা বলে বড় অঙ্কের অর্থ দাবির অভিযোগ রয়েছে। একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সাধারণ কর্মচারীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

শেবাচিম হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দেলোয়ার বাহিনীর বিভিন্ন শাখা সুসংগঠিতভাবে কাজ করে বলে অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—

প্রথম গ্রুপ রোগী ও তাদের স্বজনদের বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠিয়ে কমিশন হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দ্বিতীয় গ্রুপ:বহির্বিভাগে (আউটডোর) চিকিৎসাসেবার টিকিট কাটতে আসা নিরীহ রোগীদের ব্যাগ থেকে সুযোগ বুঝে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা চুরির অভিযোগ রয়েছে।

তৃতীয় গ্রুপ: হাসপাতালে রোগীদের দেখতে আসা দর্শনার্থীদের মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে সুযোগ বুঝে তা চুরি করে দূরবর্তী এলাকায় পাচার করার অভিযোগ রয়েছে।

শেবাচিম কম্পাউন্ডে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রেখে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগও রয়েছে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট চালককে মারধর করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া, হাসপাতালের পঞ্চম তলায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত ‘ডক্টরস ক্যান্টিন’-এর পরিচালক মজেদ ও তার ছেলে আরিফুর রহমানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দিয়ে ক্যান্টিনটি দখলের চেষ্টা চালানোর অভিযোগ রয়েছে দেলোয়ারের বিরুদ্ধে। দখলের চেষ্টা ব্যর্থ হলে পরবর্তীতে তাদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও ওঠে।

হাসপাতালের সামনের এক চা-দোকানি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বরিশাল মেডিকেল রোড এলাকার বিতর্কিত ‘বিসমিল্লাহ আবাসিক হোটেল’-এ অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মাদক বিক্রির সঙ্গেও দেলোয়ার বাহিনীর প্রত্যক্ষ যোগসাজশ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এবং সংবাদের তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

তবে অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিকদের মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ এবং ভিত্তিহীন প্রতিবাদ জানানোর জন্য চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সুশান্ত সরকার, পিপিএম-এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে পরবর্তী প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।