
স্টাফ রিপোর্টারঃঃ
বরিশাল জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে কর্মচারী বদলিকে কেন্দ্র করে মোটা অংকের আর্থিক লেনদেনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, বর্তমান জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোঃ খায়রুল আলম সুমনের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে বদলি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক সুবিধা আদায় করছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন জেলা প্রশাসকের বাংলো অফিসের সিএ মোঃ মামুন সিকদার। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত রয়েছেন ডিসি অফিসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (সংস্থাপন শাখা) সৈয়দ শহীদুল আলম এবং বরিশাল সদর উপজেলা ভূমি অফিসের অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মোঃ আরিফুজ্জামান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও পেশাগত ঘনিষ্ঠতাকে পুঁজি করে মামুন-আরিফ জুটি একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যার মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের ভেতরে এই সিন্ডিকেট এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে, অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সৈয়দ শহীদুল আলম ও সিএ মামুন সিকদার দীর্ঘদিন ধরে ডিসি অফিসের গুরুত্বপূর্ণ শাখায় দায়িত্ব পালন করে একটি প্রভাববলয় তৈরি করেছেন। চাকরির শেষ পর্যায়ে থাকা এই কর্মকর্তা এবং সিএ মামুন মিলেই অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কার্যক্রমে অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত বছরের নভেম্বর মাসে খায়রুল আলম সুমন বরিশালের জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই বদলি প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি ২০ এপ্রিল জারি হওয়া এক অফিস আদেশে একযোগে পাঁচজন কর্মচারীকে বদলি করা হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, বাবুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসের মোঃ এনামুল হককে ডিসি অফিসের স্থানীয় সরকার শাখায়, প্রবাসী কল্যাণ শাখার মোঃ আসাদুজ্জামান খানকে জেলা নাজির হিসেবে, সাধারণ শাখার রঞ্জন কুমার হালদারকে জুডিসিয়াল মুন্সিখানা শাখায়, কে.এম. মতিউর রহমানকে সাধারণ শাখায় এবং মোঃ হানিফ হোসেনকে প্রবাসী কল্যাণ শাখায় বদলি করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, এই বদলির পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। বিশেষ করে জেলা নাজির পদে বদলি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, এই পদে বসানোর জন্য সিএ মামুনের সাথে মোটা অংকের অর্থ লেনদেন হয়েছে যদিও বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বদলি হওয়া কয়েকজন কর্মচারীর সঙ্গে সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে জেলা নাজির হিসেবে বদলি হওয়া মোঃ আসাদুজ্জামান খান বরিশাল সদর উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী মোঃ আরিফুজ্জামানের বড়ভাই এবং সিএ মামুন সিকদারের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতা এই প্রক্রিয়াকে
প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একাধিক সূত্র আরও দাবি করেছে, বাবুগঞ্জ থেকে ডিসি অফিসে বদলি হয়ে আসা মোঃ এনামুল হকও সিএ মামুনের সাথে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে এই বদলি পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে সংশ্লিষ্টরা কেউই প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। এদিকে, জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সুমনের দপ্তরের সঙ্গে সিএ মামুন সিকদারের ঘনিষ্ঠ কর্ম-সম্পর্ককে ঘিরেও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, এই সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে মামুন প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব বিস্তার করছেন যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুরো পরিস্থিতি নিয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসনের ভেতরে কার্যত অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সৈয়দ শহীদুল আলমও এই সিন্ডিকেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরির শেষ প্রান্তে থাকা এই কর্মকর্তা ও সিএ মামুন মিলে ডিসি অফিসের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে অঘোষিত প্রভাব বিস্তার করছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা।
অন্যদিকে, বরিশাল সদর উপজেলা ভূমি অফিসে মোঃ আরিফুজ্জামানকে ‘অঘোষিত নিয়ন্ত্রক’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন জেলা প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি নিজস্ব প্রভাববলয় তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু সূত্রের দাবি, এই সিন্ডিকেটের কর্মকাণ্ড জেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের দৃষ্টি এড়িয়ে সম্ভব নয়। ফলে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের পেছনে আরও কোনো প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বরিশাল জেলা প্রশাসনের ভেতরে নীরব উত্তেজনা বিরাজ করছে। ইতোমধ্যে বিষয়টি প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনেকেই এ বিষয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ যাচাই এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন মহল। মোঃ এনামুল হক বলেন, কেরানিরা টাকা পাইবে কোথায়, আমি বদলির জন্য কোন আর্থিক লেনদেন করেনি। সিএ মোঃ মামুন সিকদার ০১৭১০…৩৫৫ নাম্বারে একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোন প্রতিক্রিয়া জানান নি। মোঃ আরিফুজ্জামান বলেন, আমি ছোট্ট একটা চাকরী করি, আমার সাথে এ বিষয়ে কথা বলে লাভ নেই, বলেই ফোনের সংযোগ বিচ্ছন্ন করে দেন। মোঃ আসাদুজ্জামান খানের ০১৭১২…১৩০ ব্যবহৃত নাম্বারে কল দেয়া হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি।
“উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে বরিশাল জেলা প্রশাসক মোঃ খায়রুল আলম সুমনের বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।” যা বিষয়টিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।” সূত্র দৈনিক আমাদের বরিশাল
প্রতিবেদকের নাম 













