
আল-আমীন গাজী ॥ বরিশালের আঞ্চলিক ভাষায় একটি প্রবাদ আছে- ‘মামার বাড়ি মধুর হাঁড়ি’। ৪১নং রূপাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরি-কাম-নৈশপ্রহরীর কর্মকাণ্ড দেখে এই প্রবাদের কথাই মনে পড়ছে সবার। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিয়ে স্কুলকে নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ভেবে যা খুশি তাই করছেন তিনি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে স্কুলে মাদকের আড্ডা বসানো থেকে শুরু করে চুরির ঘটনার সাথেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্ত দপ্তরি মোঃ রিয়াজ খাঁন রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকছেন। তার পরিবর্তে বৃদ্ধ বাবাকে দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন, অথচ নিয়মিত সরকারি বেতন উত্তোলন করছেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান অভিযোগগুলো হলো। রাতে স্কুলের ক্লাসরুমে কিশোর গ্যাং নিয়ে নিয়মিত মাদক সেবনের আড্ডা বসনে। ২০১৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর, সাউন্ড বড় ৯টি ফ্যান ও স্কুলের ঘণ্টাসহ মূল্যবান মালামাল চুরি। স্কুলে ডিউটি না করেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে বেতন উত্তোলন। শিক্ষার্থীদের সাথে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং শিক্ষকদের আদেশ অমান্য করা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ জানায়, ২০১৭ সালে দপ্তরি – কাম নৈশপ্রহরী দায়িত্বে থাকার সময় রাতে স্টীল আলমারীর মধ্যে থাকা ০১টি মাল্টি মিডিয়া প্রজেক্টর, ০১টি সাউন্ড বক্স, ০১টি তোয়ালে চুরি হয়। যার পূর্বে বাজারমূল্য অনুমান ৫৯,২০০/- টাকা। এঘটনায় ৪১নং রুপাতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেরিনা আখতার কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন যাহার নং – ১২৭৭।
একটি সূত্র নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলেন, ১৭ সালে চুরির পর রিয়াজ খাঁন স্কুলে ঠিকমত ডিউটি করে না। তিনি তার বাবা রশিদ খাঁনকে দিয়ে তার ডিউটি করায়। রাতে স্কুলে কিশোর গ্যাং নিয়ে নিয়মিত মাদক সেবন করেন। আর স্কুলের ক্লাস রুমের চাবি রিয়াজের কাছে থাকায় স্কুল প্রায় ৯টি ফ্যান, ১টি মাল্টি মিডিয়া প্রজেক্টর, ১টি সাউন্ড বক্স, স্কুলের ঘন্টাসহ নানা জিনিসপত্র চুরি হয়েছে। এছাড়া পুরো স্কুলে ময়লা আবর্জনায় ভরা। এতে করে ময়লায় পানি জমে জমে ডেঙ্গু মশাসহ নানা পোকামাকড়ের উৎপাত বেড়ে চলছে। স্কুলে বাচ্চাদের বাজে মন্তব্য করে দপ্তরি।
কেউ প্রতিবাদ করলেই রিয়াজ নানা ভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে। আবার রিয়াজ বাচ্চা হাজার হাজার টাকা ও স্কুলে চুরি করে মালামাল বিক্রি ও করে আসছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মেরিনা আখতার বলেন, “রিয়াজ ঠিকমতো স্কুলে আসে না। তার পরিবর্তে বৃদ্ধ বাবাকে পাঠায়। গতকালও স্কুল থেকে বেঞ্চ চুরি হয়েছে। বারবার ফোন দিলেও সে রিসিভ করে না। আমরা শিক্ষকবৃন্দ মিলে নিজেদের বেতন দিয়ে এখন একজন বিকল্প লোক রেখে স্কুল পরিষ্কার রাখছি।” উল্লেখ্য, ইতিপূর্বে চুরির মালামাল ফেরত দেওয়া ও নিয়ম মেনে চলার শর্তে একটি অঙ্গীকারনামা দিয়ে নিজের চাকরি রক্ষা করেছিলেন রিয়াজ। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। উল্টো অঙ্গিকারনামা দেয়ার পর রিয়াজ আরো বেপরোয়া হয়ে গেছে। শিক্ষক থেকে শুরু করে কাউকে কোন সম্মান করে না। যখন মন যা চায় তাই করে। ঠিকমত ডিউটিতে আসে না। তিনি আরো বলেন, স্কুল থেকে ৮ জোড়া বেঞ্চ চুরি হয়েছে। প্রতিদিনই কোন না কোন মালামাল চুরি হয়।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার নাছির উদ্দিন খলিফা সংবাদমাধ্যমকে জানান, “রিয়াজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সত্য। সে অত্যন্ত অবাধ্য প্রকৃতির লোক। দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার, মোস্তফা কামাল এ বিষয়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “স্কুলের পরিবেশ নষ্ট করে এমন কোনো মাদকসেবী বা চোরকে চাকরিতে রাখা হবে না। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বর্তমানে অভিযুক্ত রিয়াজ খাঁনের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তা বন্ধ পাওয়া যায়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা এই অরাজকতা থেকে মুক্তি পেতে প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
প্রতিবেদকের নাম 











