
মোঃ মিরাজুল ইসলাম ঃ বরিশাল একসময় খালনির্ভর ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা একটি পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। নগরীর বিভিন্ন খাল শুধু পানি চলাচলের মাধ্যমই নয়, বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ সেই খালগুলো অবহেলা, অসচেতনতা ও দায়িত্বহীনতার কারণে ধীরে ধীরে নোংরা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হচ্ছে।
চৌমাথা থেকে নবগ্রাম রোড খাল, জিয়া সড়ক থেকে মহানগর কলেজ পর্যন্ত খাল, নথুল্লাহবাদ পোল থেকে নতুন বাজার জেলখাল এবং নতুন বাজার থেকে লাকুটিয়া খালসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ জলপথগুলোর বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। খালের দুই পাড়ে বসবাসকারী একাংশ মানুষ প্রতিনিয়ত বাসাবাড়ির ময়লা, প্লাস্টিক, পলিথিন, বাজারের বর্জ্য এমনকি নির্মাণসামগ্রীও খালে ফেলছে। ফলে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সৃষ্টি হচ্ছে দুর্গন্ধ, বাড়ছে মশা-মাছির উপদ্রব এবং পরিবেশ দূষণ।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পুরো মহানগরের ওপর। এখন সামান্য থেকে মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিপাত হলেই বরিশাল মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। চৌমাথা, নবগ্রাম রোড, নথুল্লাবাদ, নতুন বাজার, জিয়া সড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ও আবাসিক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকে। এতে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়, পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় এবং অনেক বাসা-বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি হয়। বর্ষা এলেই এই দুর্ভোগ যেন নগরবাসীর নিত্যদিনের বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে।
সবচেয়ে হতাশার বিষয় হলো, বরিশাল সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নিয়মিত খাল পরিষ্কার করলেও তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। কয়েকদিনের মধ্যেই আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায় খালগুলো। এর প্রধান কারণ জনগণের একাংশের অসচেতনতা এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ। শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, যদি একইভাবে আবার খালে আবর্জনা ফেলা হয়।
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী সরকারি খাল, জলাশয় বা পরিবেশ দূষণ করা দণ্ডনীয় অপরাধ। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, সিটি করপোরেশন আইন এবং দণ্ডবিধির বিভিন্ন বিধানে এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আইনের কার্যকর প্রয়োগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই কোনো ধরনের ভয় বা জবাবদিহিতা ছাড়াই প্রতিনিয়ত খাল দূষণ করে চলেছে।
এই বাস্তবতায় বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস জাহান শিরিনের উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার। তিনি খাল উদ্ধার, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং নগরের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় খাল পরিষ্কার, উচ্ছেদ অভিযান এবং পরিচ্ছন্ন নগর গড়ার উদ্যোগ ইতোমধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তবে এসব উদ্যোগকে দীর্ঘমেয়াদে সফল করতে হলে নিয়মিত তদারকি, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
খাল রক্ষায় এখন সময় এসেছে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার। খালের পাশে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, নিয়মিত মাইকিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণা, স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে যারা খালে আবর্জনা ফেলবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কয়েকটি দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অনেকের মধ্যেই সচেতনতা তৈরি করবে।
পাশাপাশি খালের দুই পাড়ে বৃক্ষরোপণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। উন্নত নগরীগুলোতে খাল ও জলাশয়কে শুধু পানি নিষ্কাশনের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং পরিবেশ ও নগরজীবনের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। বরিশালেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে সেই ধরনের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব খাল ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা সম্ভব।
খাল রক্ষা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ খাল নোংরা হলে তার ক্ষতি পুরো নগরবাসীকেই বহন করতে হয়। জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ, দুর্গন্ধ, রোগব্যাধির বিস্তার এবং নগরের সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার প্রভাব থেকে কেউই মুক্ত থাকে না।
বরিশালকে পরিচ্ছন্ন, আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রশাসনের কঠোর অবস্থান, আইনের বাস্তব প্রয়োগ এবং জনগণের সচেতন অংশগ্রহণ একসঙ্গে নিশ্চিত করা গেলে নগরীর খালগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পাবে। খাল বাঁচলে পরিবেশ বাঁচবে, জলাবদ্ধতা কমবে, আর পরিবেশ ও খাল বাঁচলেই বাঁচবে আমাদের প্রিয় নগরী বরিশাল
প্রতিবেদকের নাম 








